সিগারেট
গত চারটা বছর খুব দ্রুত কেটে গেছে। ইউনিভার্সিটির দিনগুলোতে অনেক হতাশ ছিল আবির, তবু সময় কিভাবে সেই হতাশার মধ্য দিয়ে গলে গেল সেটা আর মনে নেই তার। এই চার বছরে পরিস্থিতির মাঝে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আবিরের বাবা মারা গেলেন, ফলে পড়াশোনার খরচ বাড়লো। এদিক-ওদিক থেকে বন্ধুরা দু'তিনটা বাড়তি টিউশনি ধরিয়ে দিয়ে তখনকার মত তাকে উদ্ধার করেছিল। কী যে ব্যস্ততায় গেছে দিনগুলো!
এরমধ্যে সে সিগারেট ধরলো, ইমম্যাচিউর যে ভাবটা তখনও ছিল সেটা ধূমপানের সাথে ম্যাজিকের মত কেটে গেল। গ্র্যাজুয়েশনের দেড় দুই বছর আগে বন্ধুরা অনেকে বড়লোক হতে শুরু করলো। কেউ বাবার ব্যবসা দেখে তো কেউ বাবার জমানো টাকা খরচ করে। আবির নিজেকে কখনো সাংঘর্ষিক করে তুলতে পারেনি। কিন্তু বন্ধুদের এই বিলাসীতায় গা ডুবিয়ে দিতে দেখে তার কেমন একটা ঈর্ষা হতে শুরু করলো।
তখন সে ঢাকার খিলগাঁও থাকে। উত্তর বাসাবোর রেলগেটে তার মেস। ঈর্ষান্বিত সেই সময়টাতে তার অবসর কেটেছে কবিতার মাঝে ডুব দিয়ে। মেসের ম্যানেজারের সাথে তার খাতির ছিল। তিনি একদিন পান্ডুলিপি দেখে বলেন, এসব লিখলেই শুধু হবে না। সম্পাদকদের সাথে যোগাযোগও রাখতে হবে।
আবির হেসে বলে, আমি তো শুধু অবসরের ক্ষুধা মিটায় নির্ঝরদা।
নির্ঝরদা তখন বিছানায় পা তুলে বসে আবিরের মুখোমুখি হন। বলেন, কবিতা অবসরের বিষয় নয়। তুমি এক কাজ করো, আজই যাও।
"কোথায়?"
"এক লিটলম্যাগ সম্পাদকের সাথে দেখা করতে।"
এই বলে তিনি দিলকুশার একটা জায়গার ঠিকানা ধরিয়ে দিয়ে ঘর থেকে বের হলেন। আবির কিন্তু সে বিষয়ে অতটা সিরিয়াস ছিল না। পাঞ্জাবির পকেটে ঠিকানার স্লিপ রেখে সে একরকম সব ভুলে গেল।
একদিন রৌদ্রপ্রহরে কোনো এক ব্যস্ততার তাড়নায় বাইরে এসে দিলকুশায় পৌঁছেছিল সে। তখনই নির্ঝরদার কথা মনে করে পাঞ্জাবির পকেটে হাত দিলো।
দিলকুশার সেই লিটলম্যাগের অফিসে গিয়ে সে অবশ্য আশাহত হয়েছিল কিছুটা। যার কথা বলা হয়েছে সে জুনিয়র সাব এডিটর। তারপরও অনেক কথা হয় তাদের। লোকটার নাম সাবের। আবির ভাবে বেকার সময় নষ্ট। লোকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবে কবিতার আলোচনা আনবার চেষ্টা করছে বারবার। কিন্তু এর যে নির্দিষ্ট কারণ ছিল তা আবির জানতো না। আসলে লোকটা আবিরকে আগ্রহী করতে চাইছিল। আবিরের একটি কবিতা পড়েই তার এই আগ্রহ।
তিনি বললেন, কবিতার ব্যাপারে প্রগাঢ় চিন্তার কোনো উৎস নেই। অনেক সময় খামখেয়ালিপনা থেকেও কবিতা আসে। কবি নজরুল চায়ের দোকানে বসে মিনিট পাঁচেকে কবিতা লিখেছেন জানেন?
আবির অল্প হেসে বলে, ওঁরা বড় মানুষ!
লোকটি সেকথা শুনতে পাননি এমন ভঙ্গিতে ঝুঁকে এসে বলেন, আপনাকে একটা সিক্রেট বলি।
"জ্বী!"
"কবিতায় আবেগ কাজ করলেও এর মূল বিষয় কিন্তু ইমমর্যালিটি।"
"আপনার কথা বুঝলাম না।"
"আধুনিক রাষ্ট্রে প্লেটো কবিদের নিষিদ্ধ করেছিল জানেন?"
"জ্বী শুনেছি।"
"নিষিদ্ধ করার একটাই কারণ কবিতা বা শিল্পের মূল উৎস যৌনতা।"
এই কথাটি শুনে আবিরের কান ঝা ঝা করে ওঠে। সে কিছু বলবার আগেই সাবের বলে, লজ্জা পাবেন না ভাই। আগেই বলেছি ইমমর্যালিটির ব্যাপার আছে। ওপরে আপনাকে বিশুদ্ধ আবেগ দেখাতে হবে। কিন্তু ভেতরে অবাধ যৌন আকাঙ্ক্ষা না থাকলে কবি হতে পারবেন না।
"বুঝতে পারছি।"
সাবের বিরক্ত হয়ে বলে, না। পারছেন না। আচ্ছা, আজ আর বলছি না। আপনি বরং আরেকদিন আসুন। সঙ্গে পান্ডুলিপি নিয়ে৷ প্রকাশ্যে প্রশংসা করা ঠিক না। বাট আপনার লেখার হাত চালু আছে।
"তাই নাকি?"
"জ্বী। আপনাকে ভাই ছোটভাই ভেবে উপদেশ দিই, জীবনানন্দের ছাপ আছে আপনার লেখায়। তবে বিনয়-উৎপল আর ভাস্কর চক্রবর্তীর লেখা ককটেল করে কিছু একটা লেখার চেষ্টা করুন। আকাশে উঠে যেতে পারেন।"
সেদিনের পর অফিস থেকে বেরিয়ে আর ও মুখো হয়নি আবির। কী দরকার, সে যে ব্যস্ত মানুষ। আজ চার বছর পর মোটামুটি গ্র্যাজুয়েশনের পরই তার চাকরি হল। এখন তো ঢাকার বাড্ডাতে থাকা হয়। কত কষ্ট করে চাকরিটা পাওয়া, তবু এখন আর যেন কিছু যায় আসে না। অফিস ফেরত বাসস্ট্যান্ড, বাসা, সন্ধ্যার পার্ক আর সাপ্তাহিক রাতের বিরিয়ানি – সব যেন পূর্বনির্ধারিত ছক। বড় কষে গেছে জীবন।
এমন অবস্থায় বারবার তার মন নস্টালজিয়ায় পরিণত হয়। সেই জুনিয়র সাব এডিটরের কথা মনে আসে। সে চার বছর পর আবারও কবিতার চর্চা ধরে। কবিতাও আসে, আগের থেকে আরও ম্যাচিউর কবিতা। প্যাটার্ন দেখে সে নিজেই মূগ্ধ হয়। কবিতাগুলো ম্যানিপুলেট করে রূপকের জগতে নিয়ে এসে একরকম আধ্যাত্মিক বোধের উন্মেষ ঘটে যায়। অন্য এক শিহরণ!
এভাবে চলছিল বেশ।
অফিস, খাওয়া, ঘুম, সান্ধ্যকালীন পার্কের ঘুরাঘুরি আর কবিতা। আহ, মধুর জীবন! একদিন অফিস ফেরত সন্ধ্যায় সে আর পার্কে ঘোরে না, কবিতার তৃষ্ণা নিয়ে দ্রুত বাসায় আসে। বদ্ধ ঘরের দরজায় চাবি ঢোকায়। ভেতরে ঢুকে সে দেখে এক লাস্যময়ী বসে ড্রেসিং টেবিলের এককোনায়।
আবির লাস্যময়ীকে জিজ্ঞেস করে, কে আপনি?
"আমাকে চিনছো না?"
"না!"
"আমিই তো কবিতাই স্বয়ং!"
"কবিতা?"
"হ্যা, কবিতার দেবী আমি। আমার আশীর্বাদেই তুমি কবি হয়েছো।"
আবির হৃদস্পন্দন অনুভব করে। লাস্যময়ী দেবী ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বলে, ভুলে গেছো অবাধ যৌনতার মাঝে কবিতার বাস?
"ভুলিনি।"
"তাহলে এসো। এসো.. কাছে এসো।"
আবির সম্মোহিতের মত কাছে যায়। তার আবেগ, তার হৃদস্পন্দন তরান্বিত হতে থাকে৷ ফ্লোরের বিছানায় তখন লাস্যময়ীর শাড়ি এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে, যেমনি করে এলোমেলো চুম্বনে তারা এখন একে-অপরে বুদ হয়ে আছে। এমনি করে কত মুহুর্ত কাটে আবির জানে না। চুম্বনে হারিয়ে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। সেই ঘুম কত সময়, কত দিন পর ভেঙেছে তাও সে জানে না। শুধু হাসপাতালে একদিন এক প্রতিবেশীর আলাপ শুনতে শুনতে জ্ঞান ফেরে। প্রতিবেশীটি ডাক্তারের সাথে তখন আলাপে ব্যস্ত।
আবির এ দৃশ্য দেখে চোখ বুজে আবার, তার ক্লান্ত বোধ হয়। জানালা গলে আসা উষ্ণ রোদে সে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমুবার আগমুহূর্তে সে শুধু ভাবে, কবিতার দেবীকে সে আবার পেতে চায়!
......
Comments
Post a Comment